শনিবার, ৬ মে, ২০১৭

বিএনপি নির্বাচনে যাবে না!

সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে পার্লামেন্টের আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। পার্লামেন্টে তেরেসার কনজারভেটিভ দলের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও শুধু জনগণের মতামত নেওয়ার জন্য দুই বছর আগেই আগাম নির্বাচন দিয়েছেন। তেরেসা নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার আগে ব্রিটেনের বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবাইনের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে ব্রেক্সিটের চরম বিরোধিতাকারী লেবার ডেমোক্র্যাট দলের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন। ব্রিটেনের পরবর্তী নির্বাচন ২০২০ সালে হওয়ার কথা ছিল কিন্তু চলমান ব্রেক্সিট সমস্যার ঐক্যবদ্ধ সমাধান খোঁজার স্বার্থে ব্রিটেনের জনগণের রায় প্রয়োজন মনে করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অনেকে তেরেসার এই আচমকা সিদ্ধান্তে অবাক হলেও সাধুবাদ জানিয়েছেন। সরকার পরিচালনায় বিভিন্ন দলের মত ও পথের পার্থক্য থাকবে কিন্তু সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী নেবে, এটাই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। বাংলাদেশে ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারির আগে একটি নির্বাচন অত্যাসন্ন। ২৯ জানুয়ারি, ২০১৪ সালে বর্তমান সংসদের প্রথম সভা হয়, সে কারণে ৫ জানুয়ারি, ২০১৪ নির্বাচন হলেও সংসদের মেয়াদ ধরা হয় সংসদের প্রথম সভার তারিখ থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর। সে মোতাবেক বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২৮ জানুয়ারি, ২০১৯ সাল। অতএব সংসদ ভেঙে না দিলে বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী ২৮ জানুয়ারি, ২০১৯ সালের আগে ৯০ দিনের মধ্যে পরবর্তী সংসদ নির্বাচিত হতে হবে। তার মানে ২৮ অক্টোবর, ২০১৮ থেকে ২৮ জানুয়ারি, ২০১৯ সালের যে কোনো দিন নির্বাচন হতে হবে। যদিও নির্বাচন পরিচালনা করার একক দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের, কিন্তু নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা সরকারকেই দিতে হবে। আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিলে সংসদ ভেঙে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত অনুরোধ করতে হবে। যদি প্রধানমন্ত্রী সংসদ ভাঙতে না বলেন তাহলে ২৭ অক্টোবর, ২০১৭ সাল পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। সরকার নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশনা দিলেই নির্বাচন কমিশন আইনগতভাবে নির্বাচনের কাজ শুরু করবে। তার আগে কোনো রাজনৈতিক দলও আইনসম্মতভাবে সরাসরি নির্বাচনের কাজ করতে পারবে না। ভোটার লিস্ট হালনাগাদ করা, নির্বাচনী এলাকা পুনর্বিন্যাস করা কোনো নির্বাচনী কাজ নয়। এগুলো নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক রুটিন ওয়ার্ক। যে কোনো নির্বাচনের বৈধ কাজ শুরু হয় নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রধানমন্ত্রী নিজে স্বহস্তে স্বাক্ষরিত পত্র নির্বাচন কমিশনকে দেবেন ততক্ষণ পর্যন্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোনো কাজ পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে তারা শুরু করতে পারবে না। নির্বাচন কমিশন যদি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে তাহলে জটিল সাংবিধানিক সমস্যা সৃষ্টি হবে। নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে তার দায়িত্ব পালন করবে কিন্তু যে কোনো নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু করতে হলে অবশ্যই সরকারের এবং সংসদ নির্বাচনের বেলায় প্রধানমন্ত্রীর স্বহস্তে স্বাক্ষরিত পত্র লাগবেই। কারণ বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদ বহাল রেখেই সংসদ নির্বাচন হতে হবে। এ কথা মানতেই হবে, আগাম সংসদ নির্বাচন এখনো সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। তা ছাড়া বিএনপি এখনো পর্যন্ত তার মূল রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসেনি। বর্তমান সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না তা প্রায় নিশ্চিত। সরকার যত কথাই বলুক না কেন বা বিএনপির ওপর মামলা-হামলা করে যতই চাপ সৃষ্টি করুক না কেন, দলের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে বলে যত ভয়ভীতিই দেখাক না কেন, বিএনপির লোভী নেতাদের যতই দলে ভিড়াক বা বিদেশিদের দিয়ে যতই চাপ সৃষ্টি করুক অথবা ২০১৪ সালের নির্বাচনে না যাওয়া বিএনপির ভুল হয়েছিল বলে যতই উপদেশ দেওয়া হোক, সরকারের সঙ্গে আলোচনা বা বোঝাপড়া ছাড়া বিএনপির পক্ষে যে নির্বাচনে আসা সম্ভব হবে না তা চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জাতিকে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। চলমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিএনপির আরেকটি রাজনৈতিক ভুল করার সুযোগ নেই। বিএনপি এখন সঠিক পথেই আছে। বিএনপির পেছানোর এখনো অনেক পথ ও সুযোগ আছে কিন্তু সরকার ছাদের প্রায় শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে। সরকারের পেছনে যাওয়ার জায়গা দিন দিন কমে আসছে। সরকারকেই এখন সামনে এগিয়ে আসতে হবে। বিএনপিকে হুমকি-ধামকি দিয়ে নয়, ভুলিয়ে ভালিয়ে নির্বাচনে নিয়ে আসতে হবে। তার জন্য উইন উইন অবস্থা তৈরি করতে হবে। সরকারকে জনগণের আস্থা অর্জন করার পথে হাঁটতে হবে। কট্টরপন্থিদের এখন পেছনের কাতারে নিয়ে যেতে হবে। বাঁচতে হলে উদার রাজনীতি সামনে নিয়ে আসতে হবে। আগামীতে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া সরকারের অন্য কোনো বিকল্প নেই। সংবিধান সরকারের সামনে শুধু দুটি পথ খোলা রেখেছে যা সরকার নিজেই তৈরি করছে। একটি হলো সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন দেওয়া অথবা সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন দেওয়া। সংসদের মেয়াদ শেষ হলে কী হবে, তা কিন্তু সংবিধানে ধোঁয়াশা রাখা হয়েছে, যার ফলে সংসদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে নির্বাচন না হলে যে সাংবিধানিক শূন্যতার সৃষ্টি হবে তা বর্তমান সরকার এককভাবে পূরণ করতে পারবে না। কাজেই সংসদের মেয়াদ পূর্তির আগে যদি নির্বাচন না হয় তাহলে সরকার অবশ্যই সাংবিধানিক সংকটে পড়বে। তবে সেই নির্বাচন যদি সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য না হয় তাহলে যেমন সরকার ঝুঁকির মধ্যে পড়বে তেমনি যদি সুষ্ঠু নির্বাচন করানোর ঝুঁকি সরকার নেয় তাহলে সরকারের চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও সৃষ্টি হতে পারে। আবার যদি সরকার একতরফাভাবে নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকতে চায় তাহলে সেটাও বুমেরাং হয়ে যেতে পারে। সময় পরিবর্তন হয়েছে। ২০১৪ সালে যা সম্ভব ছিল তা ২০১৮ বা ২০১৯ সালে সম্ভব নাও হতে পারে, না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। জনগণ একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। জনগণ ভোট দিয়ে তাদের সরকার গঠন করতে চায়। এর বাইরে জনগণ আগামীতে কোনো কিছু মেনে নেবে না তা জনগণের চোখেমুখে ইতিমধ্যেই ফুটে উঠেছে। তাই এখন সরকারকেই ভাবতে হবে সে কোন পথে হাঁটবে। একমাত্র বঙ্গবন্ধু ছাড়া সব সরকারপ্রধানের মধ্যে বর্তমান সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা সবচেয়ে চৌকস, বিজ্ঞ এবং দক্ষ প্রধানমন্ত্রী। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৩৭ বছরে যত রাজনৈতিক চাল চেলেছেন তার প্রায় সব কটিতেই তিনি বাজিমাত করেছেন। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তুলনীয় কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তার সামনে নেই। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সমস্যা আসছে। আগামী নির্বাচনটা হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশ-বিদেশসহ সব আন্তর্জাতিক মহল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে তাকিয়ে আছে তিনি কীভাবে আগামী নির্বাচনটি করান। আগামী নির্বাচন অবশ্যই সুষ্ঠু হতে হবে, জনগণের অংশগ্রহণমূলক হতে হবে এবং জনগণসহ সব মহলের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। আগামী নির্বাচনে বিএনপি এলো কি এলো না সেটি বড় বিবেচ্য হবে না, কারণ নির্বাচন বয়কট করাও গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে মানতেই হবে নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ এবং জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ অত্যাবশ্যক। বিএনপি না এলেও জনগণ যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে তাহলে সেই নির্বাচনের ফলাফল জনগণ যেমন মেনে নেবে তেমনি ভারতসহ পশ্চিমা বিশ্বও মেনে নেবে যার আলামত ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারত ছাড়া অন্য কোনো রাষ্ট্র এমনকি জাতিসংঘও মাথা ঘামাবে না বা হস্তক্ষেপ করবে না। পশ্চিমা বিশ্ব বা জাতিসংঘ তথাকথিত কট্টর ইসলামী শক্তি বা জঙ্গিদের উত্থান ঠেকানোর জন্য বর্তমান সরকারের ওপর অনেক বেশি আস্থাশীল। অথচ এ ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান মিশ্র, ঘোলাটে এবং নীরব। এ ছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে সব দেশ ও জাতি জঙ্গিবাদ উত্থানের বিরুদ্ধে। এমনকি সৌদি আরবও তথাকথিত মুসলমান উগ্রবাদীদের বিপক্ষে এবং বর্তমান সরকারের পক্ষে। বিএনপির এখন প্রায় একঘরে হয়ে যাওয়ার অবস্থা। সাম্প্রতিক অতিমাত্রায় ভারতবিদ্বেষী অবস্থান ও প্রচার-প্রচারণার জন্য ভারতের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব অনেক বেশি হয়ে গেছে, যা কমানোর তেমন কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায় না। ভারত বর্তমানে অত্র এলাকার আঞ্চলিক মোড়ল। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের অত্র এলাকার স্বার্থ দেখাশোনার দায়িত্বও ভারতের কাঁধে দিয়ে দিয়েছে বলে মনে হয়। বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারত ও চীনের কোনো দ্বন্দ্ব আছে বলে দৃশ্যমান হয় না। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর বডি ল্যাঙ্গুয়েজে সে রকমই ফুটে উঠেছে বলে অনেকের ধারণা। সন্দেহ নেই ভারত তার আন্তর্জাতিক অবস্থান, ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার কারণে চাইবে একটি সুষ্ঠু ও সর্বজনগ্রহণযোগ্য নির্বাচন। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও নিজের অবস্থান, রাজনৈতিক স্বার্থ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, দল ও পরিবারের ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব ইত্যাদি বিবেচনায় এনে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে আগ্রহী। প্রধানমন্ত্রী বলে আসছেন একমাত্র দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়। এখন এই বক্তব্যের যথার্থতা প্রমাণ দেওয়ার দায়িত্ব খোদ প্রধানমন্ত্রীর ওপরই পড়েছে। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহুবার বলেছেন, তিনি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করেন না যে বক্তব্যের প্রমাণ রাখার সময়ও সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে। ওদিকে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বিরামহীনভাবে বলে আসছেন তিনি বা তার দল আলোচনা ছাড়া এ সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনে যাবেন না। সরকার যদিও তার দলকে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে কিন্তু সরকারের মদদে দল ভেঙে গেলেও বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবস্থানের তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। কারণ আওয়ামীবিরোধী তাবৎ শক্তির একচ্ছত্র নেতা বেগম খালেদা জিয়া। কিছু দালাল, ক্ষমতালোভী, সুযোগসন্ধানী একশ্রেণির নেতা বিএনপি ছেড়ে গেলে বরং বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে। তবে তখন বেগম খালেদা জিয়ার সামনে নতুন একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। সেই চ্যালেঞ্জটি হলো, সরকার বেগম খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যখন করাতে যাবে তখন তার বিরুদ্ধে জনগণকে দাঁড় করানো। সরকার বেগম খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করার চেষ্টা করলে তিনি নিঃসন্দেহে সেই নির্বাচন বয়কট করবেন। প্রশ্ন হলো সেই বয়কট জনগণ সমর্থন করে কিনা। যদি জনগণ বেগম খালেদা জিয়ার ডাকে সাড়া দিয়ে নির্বাচন বয়কট করে এবং সরকার ৫০%-এর বেশি জনগণকে ভোট দিতে নিয়ে আসতে না পারে তাহলে নির্বাচনটি গণভোটে পরিণত হবে এবং সরকার নৈতিকভাবে তার পক্ষের ম্যান্ডেট হারাবে। জনগণকে সরকারের পক্ষে ভোট দিতে না যাওয়ার জন্য আহ্বান করা বা জনগণের কাছে গিয়ে সরকারের পক্ষে ভোট দিতে অনুৎসাহিত করা কোনো অপরাজনীতি হবে না। তা ছাড়া সে ক্ষেত্রে বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্য হবে যারাই সরকারের পাতানো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে তারা সবাই সরকারের লোক, অতএব জনগণ যেন এ পাতানো নির্বাচনে না যায়। এ নিয়ে রাজপথ গরম বা চরম কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়ারও প্রয়োজন পড়বে না। শুধু নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার মতো কোনো প্রার্থীকে ভোট না দেওয়ার জন্য জনগণের মাঝে প্রচারকাজ চালিয়ে জনগণকে সচেতন করলেই হবে। কোনো প্রার্থীকেই ভোট না দেওয়ার প্রচার-প্রচারণা নির্বাচন আচরণ বিধিতে কোনো অপরাধ হবে না। বিএনপি যদি এভাবে জনগণকে পাতানো নির্বাচনের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে পারে তাহলে সেটা হবে বিএনপির নেতৃত্বে জনগণের একটি যুগান্তকারী গণতান্ত্রিক বিজয়। কাজেই বিএনপি এ সুযোগ হাতছাড়া করবে বলে মনে হয় না। পরিশেষে আবারও বলছি, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে বিকল্প নেই। দেশ ও জনগণের স্বার্থে আগামী নির্বাচনটিকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে দুই নেত্রীকে একসঙ্গে বসে এবং ব্যক্তিগত আবেগজড়িত কারণে বসতে না পারলে সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা তৈরি করে তাতে দুই নেত্রীর সম্মতি নিয়ে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক ইশতেহার তৈরি করে তার ভিত্তিতে নির্বাচনের কর্মসূচি গ্রহণ করলে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। দুই নেত্রীকেই ছাড় দিতে হবে। আমাদের ইগোর চেয়ে দেশের জনগণের শান্তি অনেক বড়। আমরা কেউ থাকব না কিন্তু জনগণ থাকবে, দেশ থাকবে। সময়ের ব্যাপার মাত্র। ক্ষমতা কারও চিরস্থায়ী নয়। আসুন আমরা সবাই দায়িত্বশীল হই। প্রমাণ করি আমরা সবাই দেশপ্রেমিক। আমরা জনগণের কল্যাণে কাজ করি।

শুক্রবার, ৫ মে, ২০১৭

সচিব পরিচয় দিলে যদি সন্তানের সন্মান যায়

সাবেক উপ-সচিব আব্দুল মান্নান। জন্মস্থান চট্টগ্রামের মিরেরসরাই। বয়স ৮০ ছুঁইছুঁই। ১৯৯৭ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিবের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। জীবনের সব পরিশ্রম, ঘাম ও মেধা দিয়ে এক ছেলে ও দুই মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ কর‍ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ১৪ বছর ধরে একাকী সময় পার করছেন আগারগাঁওয়ের প্রবীণ নিবাসের ৪১৩ নম্বর কক্ষে। আব্দুল মান্নান চট্টগ্রাম কলেজ থেকে পড়ালেখা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। উপ-সচিব থেকে অবসর নেওয়ার কিছু দিন পরেই তার ঠিকানা হয় নগরীর এই প্রবীণ নিবাসে। সারা জীবনের অর্জিত সম্পদ দিয়ে ছেলেমেয়েদের মানুষ করার চেষ্টা করে গেছেন। হয়তো ভেবেছিলেন সন্তানদের পড়াশুনা করিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই জীবনের বাকিটা সময় সুখ স্বাচ্ছন্দেই কাটবে তার। জীবনের শেষ সময়ে অসহায় পিতার সহায় হবে সন্তানেরা। কিন্তু বিধি বাম। বৃদ্ধের শেষ ঠিকানা হয় প্রবীণ নিবাসেই। শেষ সময়ে পেনশনে পাওয়া টাকা দিয়ে কোনোমতে খেয়ে পরে নিঃসঙ্গ জীবন পার করছেন আব্দুল মান্নান। প্রবীণ নিবাসে থাকা প্রসঙ্গে অভিমানি আব্দুল মান্নান জানান, আমি স্বতন্ত্রভাবেই থাকতে পছন্দ করি। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে থাকলে এক কথা, দুই কথা করে অনেক কিছুই হবে। জীবনের কোনো স্বাধীনতা থাকবে না। ছেলে মেয়েরা কি করে এমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুল মান্নান জানান, আমি সচিব ছিলাম এখন প্রবীণ নিবাসে আছি। ওদের পরিচয় দিতে পারবো না। ওদের পরিচয় দিলে ওদের মান সম্মান সব শেষ হয়ে যাবে। ছেলে মেয়েদের পরিচয় দেওয়া যাবে না। তিনি আরো জানান, বড় ছেলে অস্ট্রেলিয়ান এক গ্যাস কোম্পানিতে চাকরি করে। মেঝ মেয়ে ও তার জামাই বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করে এবং ছোট মেয়ে মিরপুরের একটি ইংলিশ মিডিয়াম কলেজের লেকচারার। ছেলে মেয়েদের আপত্তি থাকার কারণে ছেলে মেয়েদের নাম বলতে চাননি আব্দুল মান্নান। একাকী থাকতে কেমন লাগে এমন প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে গাল বেয়ে গড়াতে থাকে নোনা জল। ছেলে মেয়েরা না এলেও বাবা বলে কথা। সন্তানদের প্রতি ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। ছেলে মেয়েরা পিতাকে না দেখলেও দেওয়ালে টানানো ফ্রেমে বন্দি তাদের ছবিগুলো দ্যাখেন সারাক্ষণ। এখন সময় পার করেন ইসলামী বই, কবিতা, উপন্যাস ও খবরের কাগজ পড়ে। আব্দুল মান্নান যে একজন বইয়ের পোকা তার রুম দেখলেই তা আর মুখে বলে দিতে হবে কাউকে। প্রায় দুই শতাধিক বই রুমে সাজিয়ে রেখেছেন তিনি। অধিকাংশ সময়ই এসব বই পড়ে সময় পার করেন আব্দুল মান্নান। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালের এক বন্ধুকে গবেষণার কাজে সাহায্য করছেন তিনি প্রবীণ নিবাসে বসেই। এভাবেই প্রতিদিন জানালার দিকে অপলক দৃষ্টিতে কার যেনো পথ চেয়ে সময় পার করেন তিনি। নিঃসঙ্গ জীবনে গল্প করার সঙ্গী পেলে তাকে আর সহজে ছাড়তে চান না। ২০০৬ সাল থেকে একই প্রবীণ নিবাসের ৪১৭ নম্বর কক্ষে আছেন জাহাঙ্গীর হোসেন (প্রতীকী নাম)। জাহাঙ্গীর হোসেনের জীবনের গল্পটা আরো করুণ। ৩৫ বছর বিদ্যুত বিভাগে চাকরি করেছেন। যাবতীয় সম্পদ ছেলে মেয়েদের পড়াশুনার জন্য খরচ করেছেন, নিজের জন্য কিছুই সঞ্চয় করেননি। জীবনের শেষ সময়েও এসে একটা ভুল করেছেন জাহাঙ্গীর হোসেন। চট্টগ্রামের সোসাইটিতে অবস্থিত ৫ কাঠা প্লটের ওপর একটি বাড়ি সন্তানদের নামে লিখে দিয়েছেন। তাই এখন ঠিকানা বলতে এই প্রবীণ নিবাস। তার জন্মস্থান চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহরেই। বিয়ে করেন সিলেটে। তিন সন্তানের জনক জাহাঙ্গীর হোসেন। বড় মেয়ে সিলেট মেডিকেল কলেজের কর্মকর্তা। ছোট মেয়ে ও তার জামাই কানাডায় থাকে। দুই সন্তান মাঝে মধ্যে ফোনে যোগাযোগ রাখলেও বড় ছেলে কোনো যোগাযোগ রাখে না। বড় ছেলে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের লেকচারার। জাহাঙ্গীর হোসেন ১৯৫৭ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা পলিটেকনিক থেকে ডিপ্লোমা করে বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডে ৩৫ বছর চাকরি করেন। চাকরি শেষে তার ঠিকানা হয়েছে আগারগাঁও প্রবীণ নিবাসের ৪১৭ নম্বর কক্ষে। শেষ বয়সে জীবনের এই করুণ পরিণতি হবে ভাবতে পারেন নি জাহাঙ্গীর হোসেন। শেষ বেলায় প্রবীণ নিবাসে থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৩৫ বছর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে চাকরি করেছি। ছেলে মেয়েদের পড়াশুনা কর‍াতে গিয়ে এক টাকাও সঞ্চয় করিনি। জীবনের শেষ বেলায় এসে চট্টগ্রাম শহরে ৫ কাঠা জমি ছিল সেটাই ছেলের নামে লিখে দিয়েছি। একাকী জীবন কেমন লাগছে এমন প্রশ্নের জবাবে, কাঁধে রাখা গামছা দিয়ে চোখের নোনা জল মুছতে থাকেন জাহাঙ্গীর। জীবনের শেষ মুহ‍ূর্তেও ছেলে-মেয়েদের জন্য ভালোবাসার কোনো কমতি নেই বৃদ্ধের। তাইতো ছেলে মেয়ের কোনো পরিচয় দিতে চাননি। যদি ছেলে মেয়েদের সম্মান যায়! জন্মের পর থেকে তিল তিল করে যে ছেলে মেয়েদের মানুষের মতো মানুষ করার চেষ্টা করেছেন সেই তাদেরই জন্য বোঝা এই বৃদ্ধ। রোববার বাবা দিবসে এসব বাবাদের জীবনের মিল খুঁজে পাওয়া যায় শিল্পী নচিকেতার সেই চিরচেনা সুরে… ছেলে আমার মস্ত মানুষ মস্ত অফিসার মস্ত ফ্লাটে যায় না দেখা এপার ওপার নানান রকম জিনিস আর আসবাব দামি দামি সবচে কমদামি ছিলাম একমাত্র আমি ছেলের আমার, আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম।।

বৃহস্পতিবার, ৪ মে, ২০১৭

পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুটোই কমেছে

এবছর মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৮০ দশমিক ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। অথচ গত বছর এই পরীক্ষায় ৮৮ দশমিক ২৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছিল। অর্থাৎ গড় পাসের হার ৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, এবার মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৭৬১ জন। গত বছর এই সংখ্যা ১ লাখ ৯ হাজার ৭৬১ জন। গতবারের চেয়ে এবার ৫ হাজার শিক্ষার্থী কম জিপিএ-৫ পেয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের এই সার সংক্ষেপ হস্তান্তর করেন। এ সময় বোর্ডের চেয়ারম্যানেরাও উপস্থিত ছিলেন। এরপর বেলা ১২টায় সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এবারের ফলাফলের বিভিন্ন দিক তুলে ধরবেন শিক্ষামন্ত্রী। পরে দুপুর ২টা থেকে শিক্ষার্থীরা ফল জানতে পারবেন।

শনিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১৭

জুলাই থেকে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ চালুর

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে ঢাকাসহ অন্য বিভাগীয় শহরগুলোর মতো গাজীপুরে মেট্রোপলিটন পুলিশ গঠন করা হচ্ছে। আগামী জুলাই থেকে গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি)’র কার্যক্রম শুরু করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতি রয়েছে। ২৮ এপ্রিল শুক্রবার দৈনিক মানবজমিন- পত্রিকায় প্রকাশিত ‘জুলাই থেকে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ চালুর প্রস্তুতি’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিএমপি’র ইউনিট গঠন আইনের খসড়া প্রস্তাবটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কিছু সংশোধনীর পর প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। দেশে বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, বরিশাল ও খুলনায় মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিট রয়েছে। অনুমোদন পেলে গাজীপুর সপ্তম মেট্রোপলিটন হিসেবে যাত্রা শুরু করবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও গাজীপুর জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক মো. নূরুল ইসলাম জানান, আগামী সংসদ অধিবেশনে এর আইনি রূপ দেয়ার জন্য উত্থাপনের প্রস্তুতি রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ইতিমধ্যে এই নতুন পুলিশ ইউনিট তৈরির কাগজপত্র চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর প্রস্তুতির সব কিছুই শেষ হয়েছে। এখন যে কোন সময় কেবিনেটে পাঠানো হবে। আর সংসদ অধিবেশনে বিল পাস হয়ে গেলেই জিএমপি’র কার্যক্রম শুরু করতে আর কোন বাধা থাকবে না। ইতিমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে। তিনি বলেন, গত ৭ই ডিসেম্বর মন্ত্রিসভায় জিএমপি’র প্রস্তাব অনুমোদনের পর তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য একটি কমিটি গঠন করে দেয়া হয়। ওই কমিটি গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে বৈঠক করে জিএমপি গঠনের প্রস্তাব চূড়ান্ত করে। আইন মন্ত্রণালয় থেকে ভেটিং শেষে সেটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখান থেকে অনুমোদন হলেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে যাত্রা শুরু করবে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিট। জিএমপিতে বর্তমানে গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় থাকা জয়দেবপুর ও টঙ্গী থানা এবং কোনাবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ি, ভোগড়া ও পূবাইল পুলিশ ক্যাম্প এলাকা নিয়ে মোট ১০টি থানা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত জিএমপি’র নতুন থানাগুলোর নাম হবে-জয়দেবপুর থানা, সালনা থানা, চৌরাস্তা থানা, কোনাবাড়ী থানা, মৌচাক থানা, কাশিমপুর থানা, বোর্ডবাজার থানা, মীরেরবাজার থানা, টঙ্গী পূর্ব-থানা ও টঙ্গী পশ্চিম থানা। গাজীপুর মেট্রোপলিটনের প্রধান উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি)সহ বিভিন্ন পদমর্যাদার মোট আট হাজার ২শ’ ২৬ জনবলের প্রস্তাব করা হয়েছে। গাড়ি চাওয়া হয়েছে ১ হাজার ২শ’ ১৭টি। এর মধ্যে ২৬৫টি ক্যাডার পদ। এর মধ্যে ডিআইজি পদবির একজন দায়িত্ব পালন করবেন কমিশনার হিসেবে। তিনজন অতিরিক্ত ডিআইজি, এসপি পদ মর্যাদার ২১ জন ডিসি (ডেপুটি পুলিশ কমিশনার), এডিসি ৪৯ জন ও এএসপি ১৯১ জনের পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছে। গাজীপুর মেট্রোপলিটন হওয়ার পরও গাজীপুর জেলা পুলিশ বিদ্যমান থাকবে। এতে বছরে খরচ হবে ১শ’ ৮৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। বর্তমানে গাজীপুর জেলায় পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার প্রায় ১ হাজার ২শ’ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য রয়েছেন। গাজীপুর ও টঙ্গী পৌরসভা এলাকার ৩২৯ দশমিক ৯০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে ২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি গঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশন যাত্রা করে। গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় বেশ কয়েকটি কেন্দ্রীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যার মধ্যে দু’টি গবেষণা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইইউটি), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্‌রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট, সমরাস্ত্র কারখানা, সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (টাকশাল), বাংলাদেশ কৃষি ও ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট, টেলিযোগাযোগ স্টাফ কলেজ, কিশোর ও কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্র, কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার, জেলা কারাগার, টেলিফোন শিল্প সংস্থা, দু’টি রেলওয়ে জংশন, তিনটি রেলওয়ে স্টেশন, একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ, তিনটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও কয়েকটি সরকারি হাসপাতাল। এছাড়া অসংখ্য গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিসহ বহু শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বর্তমানে এই মহানগরের জনসংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ। এছাড়া মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত বিশ্ব ইজতেমা গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকার টঙ্গীতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

বৃহস্পতিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

সানজিদা আক্তার জিপিএ-৫.০০ পেয়েছে


সানজিদা আক্তার সাদিয়া সালনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে psc পরিক্ষা ২০১৬ অংশ গ্রহন করে জিপিএ ৫.০০ পেয়েছে। তার বাবার নাম মোঃ ছানোয়ার হোসেন, মাতার নাম জায়েদা খাতুন। সানজিদা আক্তার সাদিয়া বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায়। সে সকলের কাছে দোয়া চেয়েছেন। আপনারা সবাই তার জন্য দোয়া করবেন।


সোমবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

জেএসসি পরীক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার, আটক ৪


গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কারখানা বাজার এলাকা থেকে শুক্রবার রাতে নিখোঁজ এক স্কুলছাত্রের মরদেহ সেপ্টিট্যাংকি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বুধবার ট্রাকচালকসহ চারজনকে আটক করেছে পুলিশ।
নিহত স্কুলছাত্রের নাম আতিকুর রহমান (১৫)। সে সিটি কর্পোরেশনর কাউলতিয়া বিপ্রবর্থা এলাকার আব্দুর রশিদের ছেলে।
এ ঘটনায় ৪ জনকে আটক করা হয়, ট্রাক চালক আব্দুল আলিম (৩২), ইটভাটার শ্রমিক খোরশেদ আলম (২২), শাহিনুর রহমান (২২) ও শফিকুর রহমান টাইগার (২৩)। আটকদের একজনের দেয়া স্বীকারোক্তিতে ঘটনা তদন্তে বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পুলিশ কারখানা বাজার এলাকার দেওয়ান ব্রিকস-এ অভিযান চালিয়েছে।
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ঐ এলাকার জনগণ জানান, আতিক স্থানীয় বিপ্রবর্থা এলাকার আব্দুর রশিদের ছেলে। সে কাউলতিয়া জহির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবার জেএসসি পরীক্ষা দিয়ে ওই ভাটার ট্রাকে শ্রমিকের কাজ নেয়।
শুক্রবার রাতে আতিক ইটভাটার উদ্দেশে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। আতিক নিখোঁজ হওয়ার পর সোমবার দুপুরে তার সঙ্গে থাকা ওই চারজনকে ডেকে স্থানীয়দের নিয়ে শালিস করা হয়। এ সময় তারা একেকবার একেক তথ্য দিলে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পরে তাদের পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
জয়দেবপুর থানা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) মাহমুদুল হাসান তাদের আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, শনিবার ভোরে আটকদের সঙ্গে স্কুলছাত্র আতিকুর রহমান (১৫) একটি ট্রাকে ইট লোড করার পর ওই ট্রাকে উঠে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

পরে ঢাকার আজিমপুর এলাকায় ইট আনলোড করার সময় দুর্ঘটনায় (ট্রাকের ঢালার আঘাতে) আতিক মারা যায়। সেখান থেকে তার মরদেহ এনে ইটভাটার মালিক ইমরান দেওয়ানের কাছে হস্তান্তর করে বলে জানায় আটক শাহীনুর।
আটকদের দেয়া তথ্যানুযায়ী বুধবার ওই ইটভাটায় অভিযান চালানো হয়েছে। ইটভাটার মালিক ইমরান ও ম্যানেজার রফিকুল ইসলামকে সেখানে পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর থেকে তারা পলাতক রয়েছেন। তাদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তা বন্ধ পাওয়া গেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান থানা পুলিশের এ পরিদর্শক।


রবিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

স্বাধীনতাযুদ্ধের একজন অগ্রগণ্য সেনানায়ক


১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কাল রাতে জিয়াউর রহমান ছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একজন মেজর। সে রাতে চট্টগ্রাম বন্দরে অস্ত্র খালাসরত পাকিস্তানি এক জেনারেলের কাছে তাঁকে পাঠানো হচ্ছিল। পরিকল্পনা ছিল তাঁকে ‘গ্রেপ্তার বা হত্যা’ করার (গোলাম মুরশিদ, মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর: একটি নির্দলীয় ইতিহাস)।
পথিমধ্যে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের সংবাদ শোনামাত্র বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নেন। চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ফিরে এসে তাঁর কমান্ডিং অফিসারসহ অন্যান্য পাকিস্তানি অফিসার ও সৈন্যকে বন্দী করেন। পরদিন তিনি প্রাণভয়ে পলায়নপর মানুষকে থামিয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার উদ্দীপনাময় ভাষণ দিতে শুরু করেন (বেলাল মোহাম্মদ, স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র)। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনি বেতারে নিজ কণ্ঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
জিয়ার এই রূপান্তর বা উত্থান বিস্ময়কর হতে পারে, কিন্তু তা আকস্মিক ছিল না। বরং বাংলাদেশের মানুষের বঞ্চনা, স্বাধীনতার স্বপ্ন, সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ একজন সৈনিককেও কীভাবে উদ্দীপিত করেছিল, এটি ছিল তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত (জিয়াউর রহমান, ‘একটি জাতির জন্ম’)।
জিয়া ছিলেন স্বাধীনতাযুদ্ধের একজন অগ্রগণ্য সেনানায়ক। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ১১ জন সেক্টর কমান্ডারের একজন ছিলেন। ৪৯ জন যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধাকে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার সর্বোচ্চ বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করে। তিনি তাঁদের একজন ছিলেন। কিন্তু তিনি সেক্টর কমান্ডার ও বীর উত্তম খেতাবধারীদের মধ্যেও অনন্য ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে। ২৭ মার্চ এই ঘোষণা ‘মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের’ পক্ষে তিনি প্রদান করেন কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে।
এরপর জিয়া চট্টগ্রাম যুদ্ধাঞ্চল, ১১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক এবং পরে জেড ফোর্সের প্রধান হিসেবে বহু আলোচিত যুদ্ধের নেতৃত্ব প্রদান করেন। যুদ্ধের শেষ ভাগে সিলেট অঞ্চলে তাঁর বাহিনীর কাছেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। তিনি সেক্টর কমান্ডার আবু তাহের, এম এ জলিল বা খালেদ মোশাররফের মতো সম্মুখযুদ্ধের অসীম সাহসী যোদ্ধা ছিলেন না। সমশের মবিন চৌধুরী ও হাফিজ উদ্দিনের ন্যায় তাঁর নিজস্ব বাহিনীর অফিসারদের মতো তিনি যুদ্ধ করতে গিয়ে আহতও হননি। কিন্তু ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী যুদ্ধে তাঁর বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম শক্তিশালী প্রভাবকের ভূমিকা রেখেছে, কিছু ক্ষেত্রে তাঁকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে।
জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। তাঁর আগে মাওলানা ভাসানী স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, ছাত্রনেতারা স্বাধীন বাংলাদেশের স্লোগান দিয়েছিলেন ও বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। একাত্তরের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন, এ জন্য সবাইকে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকি ২৫ মার্চ কাল রাতের পর জিয়ার আগেই চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা এম এ হান্নান বেতারে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও বিভিন্ন কারণে জিয়াউর রহমানের ঘোষণার তাৎপর্য ছিল অন্য রকম।
প্রথমত, শক্তিশালী সম্প্রচারকেন্দ্রে বারবার সম্প্রচারিত হওয়ার ফলে জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণাটিই কেবল দেশের সব অঞ্চল থেকে বহু মানুষ শুনতে পেয়েছিল। পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর আক্রমণের মুখে দিশেহারা ও পলায়নপর অবস্থায় এটি মানুষের কাছে পরম ভরসার বাণী হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয়ত, জিয়ার ঘোষণাটি ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একজন বিদ্রোহী বাঙালি অফিসারের এবং বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে। এটি মানুষকে প্রতিরোধের সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রবলভাবে আশান্বিতও করেছিল।
মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান এ কে খন্দকার ২০০২ সালে এক স্মৃতিচারণায় বলেন, ‘যুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীর একজন বাঙালি মেজরের কথা শোনা সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার। আমি নিজে জানি, যুদ্ধের সময় জানি, যুদ্ধের পরবর্তী সময়েও জানি যে মেজর জিয়ার এই ঘোষণাটি পড়ার ফলে সারা দেশের ভেতরে এবং সীমান্তে যত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সাংঘাতিক একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করল যে, হ্যাঁ, এইবার বাংলাদেশ একটা যুদ্ধে নামল।’ (এ কে খন্দকার, মঈদুল হাসান ও এস আর মীর্জা, মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর: কথোপকথন)। জিয়ার ঘোষণায় উৎসাহিত বা উদ্দীপিত হয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ এবং ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম (মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি), এইচ টি ইমাম (বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১), অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের (আমার একাত্তর) মতো আরো বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও। তাঁর ঘোষণার গুরুত্বের উল্লেখ আছে মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতের সক্রিয় কূটনীতিক জে এন দীক্ষিতসহ ট্রেভর ফিসলক, ডেভিড লুডেনের মতো বহু আন্তর্জাতিক ব্যক্তিদের ভাষ্যে (মাহফুজ উল্লাহ, প্রেসিডেন্ট জিয়া অব বাংলাদেশ)।
তবে মনে রাখতে হবে, জিয়ার ঘোষণাটির অতুলনীয় প্রভাব পড়ে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে এটি দেওয়া হয়েছিল বলে। মুক্তিযুদ্ধের গবেষক মঈদুল হাসান লিখেছেন, ‘মেজর জিয়া তাঁর প্রথম বেতার বক্তৃতায় (২৭ মার্চ সন্ধ্যা) নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করলেও পরদিন স্থানীয় নেতাদের পরামর্শক্রমে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নিদের্শে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা প্রকাশ করেন। এই সব ঘোষণা লোকের মুখে মুখে বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়ে, শেখ মুজিবের নির্দেশে সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালিরা স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই শুরু করেছে।’ (মূলধারা ’৭১)
২. ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু করার জন্য পাকিস্তানি বাহিনীর বাঙালি অফিসারদের কাছে কোনো সুস্পষ্ট বা সরাসরি নির্দেশ ছিল না। কিন্তু ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী নেতা বঙ্গবন্ধুর কাছে পাকিস্তানের শাসনভার প্রদানে অনীহার ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁরা সচেতন ছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনীতে তাঁদের প্রতি বৈষম্য ও বঞ্চনা নিয়েও প্রচণ্ড ক্ষোভ ছিল (রফিকুল ইসলাম, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে)।
এ কারণে তাঁদের অনেকেই ২৫ মার্চে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যার সংবাদ শোনামাত্র বিদ্রোহ করেন। বাঙালি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে জিয়া বিদ্রোহ করেন সবার আগে (মুরশিদ, পূর্বোক্ত)। ২৮ মার্চের মধ্যে বিদ্রোহ করেন সেক্টর কমান্ডারদের প্রায় সবাই। কিন্তু তাঁদের বিক্ষিপ্ত বিদ্রোহকে সমন্বিত, সুশৃঙ্খল ও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা এবং এটিকে পরিপূর্ণ একটি স্বাধীনতাযুদ্ধে পরিণত করার ব্যাপারে জিয়াসহ প্রত্যেকে সচেতন ছিলেন। যুদ্ধের সময়কালে বিভিন্ন ঘটনায় তাঁদের এই অসাধারণ প্রজ্ঞা, দায়িত্ববোধ ও রণকৌশলের পরিচয় পাওয়া। এবং এখানেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে আমরা জিয়াকে অনন্য বা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে দেখি। প্রথমত, ৩ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করার ঠিক পরদিন জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ, কে এম সফি উল্লাহসহ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী ইউনিটগুলোর কমান্ডাররা তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে বৈঠক করেন। সেখানে তাঁরা ভারতের সামরিক সাহায্য এবং দেশের রাজনীতিবিদদের নিয়ে স্বাধীন সরকার গঠনের আবশ্যকতা প্রশ্নে একমত হন, বিদ্রোহী ইউনিটগুলো নিয়ে সম্মিলিত মুক্তিফৌজ গঠন করেন এবং এম এ জি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান হিসেবে স্থির করেন। ৪ এপ্রিলের এই বৈঠকই ছিল বাংলাদেশ মুক্তি বাহিনীর প্রথম সাংগঠনিক ভিত্তি।
দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ সরঞ্জামের অভাব, কেন্দ্রীয় কমান্ডের নিষ্ক্রিয়তা এবং কূটনৈতিক স্বীকৃতি দানে ভারতের বিলম্বের কারণে একাত্তরের মে থেকে জুলাই মাসের প্রথম ভাগ পর্যন্ত হতোদ্যম পরিস্থিতিতে যুদ্ধাঞ্চলের অধিনায়কদের এক সম্মেলনে জিয়াই নতুন চিন্তা নিয়ে আসেন। ১০ থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত মুক্তি বাহিনী সদর দপ্তরে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে এটি অনুষ্ঠিত হয়। এর সূচনায় মুক্তিযুদ্ধের অধোগতি রোধ ও যৌথ কমান্ড-ব্যবস্থায় যুদ্ধ পরিচালনার জন্য যুদ্ধ কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব দেন জিয়া। তাঁর এই প্রস্তাবে একজন বাদে বাকি সব সেক্টর কমান্ডারের সম্মতি ছিল। মিন্ত্রসভার সমর্থন থাকলে এটি যুক্তিসংগত বলে মেনে নিতে পারতেন তাজউদ্দিন। তাতে যুদ্ধ আরও গতিশীল হতে পারত (এ কে খন্দকার, মঈদুল হাসান ও এস আর মীর্জা, মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর: কথোপকথন)। তবে সেই সম্মেলনে গেরিলাযুদ্ধের পাশাপাশি সম্মুখসমর, মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যৎ সেনাবাহিনী গঠনের প্রস্তুতি হিসেবে ব্রিগেড গঠনের যে সিদ্ধান্ত হয়, তা রূপায়ণের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকেই।
সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে মেজর জেনারেল কে​ ভি কৃষ্ণ রাওয়ের সঙ্গে জেড ফোর্স কমান্ডার জিয়াউর রহমান (বাঁ থেকে দ্বিতীয়), ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। ​ছবি: সংগৃহীত
তৃতীয়ত, জুলাই মাসের এই সম্মেলনে জিয়ার নেতৃত্বাধীন ব্রিগেড গঠনের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হলেও পরে কর্নেল ওসমানীর একক সিদ্ধান্তে আরও দুটি ফোর্স গঠিত হয় (এ কে খন্দকার, পূর্বোক্ত)। জেড ফোর্স নামে পরিচিত জিয়ার ব্রিগেড একাত্তরে দ্রুত কাজ শুরু করে। ঢাকামুখী অভিযানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাকিস্তানি বাহিনীর কামালপুর ঘাঁটিতে তারা ৩১ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট কয়েক দফা হামলা চালায়। ১ আগস্ট জেড ফোর্স বাহাদুরবাদ এবং ৩ আগস্ট শেরপুরে নকশি বিওপিতে আক্রমণ করে। এসব দুঃসাহসিক সম্মুখসমরে অনেক পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। কামালপুর যুদ্ধে অনেক মুক্তিযোদ্ধাও শহীদ হন। জিয়াকে এ জন্য কিছু সমালোচনাও মেনে নিতে হয়। কিন্তু এসব যুদ্ধ মুক্তি বাহিনীর সামর্থ্য ও সাহসিকতা সম্পর্কে নতুন উপলব্ধির জন্ম দেয়।
চতুর্থত, মুক্তিযুদ্ধের শেষ ভাগে জিয়াকে আমরা দেখতে পাই সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর আক্রমণাত্মক যুদ্ধের অধিনায়ক হিসেবে। একাত্তরের অক্টোবরে যৌথ সামরিক নেতৃত্ব গঠনের পর যুদ্ধের নীতিনির্ধারণের দায়িত্ব চলে যায় ভারতের জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের কাছে। নভেম্বরে ভারতীয় বাহিনী নিজ দেশের সীমান্তে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় বাংলাদেশের সেক্টর ও ফোর্সগুলো আরও মুহুর্মুহু আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
ওসমানীর নিদের্শ অক্টোবর মাসে পুরো জেড ফোর্স নিয়ে মেজর জিয়া চলে আসেন সিলেটে। এর তিনটি ব্যাটালিয়ন শ্রীমঙ্গল, ছাতক ও কুলাউড়ায় অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা ও ক্যাম্পে সরাসরি হামলা চালায়। ১০ ডিসেম্বর এই ফোর্স সিলেট আক্রমণ শুরু করে। ১৪ তারিখ তারা সিলেটে প্রবেশ করে। যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে তিনি একদিন বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন, সিলেটে ১২৫ জন অফিসার, ৭০০ সৈন্যসহ সেই বাহিনীর একটি অংশ তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করে।
৩. বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদান ছিল অপরিসীম। স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করা ছাড়াও যুদ্ধ পরিচালনা ও যুদ্ধ প্রশাসনের নীতি-নির্ধারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মুক্তিযুদ্ধের সময়। জিয়া ছিলেন এই যুদ্ধে মহানায়কের মতো আরও ছিলেন খালেদ মোশাররফ, আবু তাহের, আবু ওসমান, এম এ জলিল, রফিকুল ইসলামসহ অন্যান্য সেক্টর কমান্ডাররা। মুক্তিযুদ্ধ সর্বোপরি ছিল একটি জনযুদ্ধ, বহু সাধারণ মানুষের অসাধারণ আত্মত্যাগ আর শৌর্যবীর্যের এক অনুপম গৌরবগাথা।
বাংলাদেশের এই বীর সন্তানেরা ছিলেন অত্যুজ্জ্বল এক নক্ষত্রমণ্ডলীর মতো। সে নক্ষত্রমণ্ডলীর সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন বঙ্গবন্ধুই। কিন্তু তাই বলে অন্য কোনো নক্ষত্রের আলোও ম্লান হতে পারে না, অন্য কোনো নক্ষত্রও মুছে যেতে পারে না।
জিয়া আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের এমনই এক অবিনশ্বর নক্ষত্র। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে শুধু জিয়া নন, আরও অনেকের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে পেক্ষ–বিপক্ষে নানা আলোচনা রয়েছে। কিন্তু সেটি তাঁদের একাত্তরের ভূমিকাকে ম্লান করতে পারে না।
লেখক- আসিফ নজরুল। অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।